টিন সার্টিফিকেট সংগ্রহ, আবেদন, সংশোধন ও বাতিল করার নিয়ম: আয়কর রিটার্ন দাখিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক বা দাপ্তরিক কাজের জন্য ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। অনলাইনে খুব সহজেই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নতুন টিন সার্টিফিকেট তৈরি, ডাউনলোড, নবায়ন বা সংশোধন করা সম্ভব। আজকে আমরা আপনাদের সাথে আলোচনা করব কিভাবে নতুন টিন সার্টিফিকেট তৈরি করবেন, প্রয়োজন শেষে কিভাবে টিন সার্টিফিকেট বাতিল বা সংশোধন করবেন এবং অনলাইন থেকে কিভাবে ডাউনলোড করবেন।
টিন সার্টিফিকেট কি এবং এটি কেন প্রয়োজন?
TIN-এর পূর্ণরূপ হলো Taxpayer Identification Number। এটি একটি ১০ বা ১২ ডিজিটের নির্দিষ্ট নম্বর যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক করদাতাদের প্রদান করা হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স করা, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং বিভিন্ন পেশাগত কাজে টিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। বর্তমান সময়ে যারা বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন কিংবা ওয়েবসাইট খুলে টাকা আয় করছেন বা ফ্রি ল্যান্সিং করছেন, তাদের জন্যও নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় থাকলে টিন সার্টিফিকেট সংগ্রহ এবং রিটার্ন প্রদান আবশ্যক।
টিন সার্টিফিকেট থাকলেই কি কর দিতে হবে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে যে টিন সার্টিফিকেট থাকলেই কি প্রতি বছর আয়কর দিতে হবে কিনা। মূলত টিন সার্টিফিকেট থাকলেই সবাইকে কর দিতে হয় না, তবে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। যাদের করযোগ্য আয় নেই, তারা ‘শূন্য রিটার্ন’ (Zero Return) জমা দেবেন। নিম্নে কাদের জন্য আয়কর বা রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক তা আলোচনা করা হলো:
- যদি আয় বছরে করদাতার মোট করযোগ্য আয় নির্ধারিত করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
- মোটর গাড়ির (কার, জিপ, মাইক্রোবাস) মালিকানা থাকলে।
- মূল্য সংযোজন কর আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত কোন ক্লাবের সদস্যপদ থাকলে।
- সিটি কর্পোরেশন অথবা পৌরসভায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স থাকলে।
- ডাক্তার, আয়কর আইনজীবী, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত থাকলে।
- চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ বা কোনো ট্রেড এসোসিয়েশনের সদস্য হলে।
- পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল পদপ্রার্থী।
- সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় ঠিকাদারি কাজে অংশ নিলে।
- সরকারি বা বেসরকারি চাকুরীরতদের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে।
টিন সার্টিফিকেটের প্রধান কাজসমূহ
অনলাইনে তৈরি টিন সার্টিফিকেট আপনার ব্যবসায়িক এবং ব্যক্তিগত লেনদেনে নানাবিধ কাজে লাগে। যেমন:
- পণ্য বা সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (IRC) গ্রহণে।
- সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে।
- যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক দরপত্রে (Tender) অংশগ্রহণের জন্য।
- সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জমি, ভবন বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করার সময়ে।
- ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু বা লোনের আবেদন করতে।
- কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন এবং কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার হওয়ার জন্য।
- ড্রাগ লাইসেন্স ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের জন্য।
- যেকোনো ব্যবসায়িক সমিতির সদস্য পদ লাভ বা নবায়ন করতে।
- পেশাদার কাজের লাইসেন্স গ্রহণের জন্য।
নতুন টিন সার্টিফিকেট আবেদন করার সহজ নিয়ম

নতুন ই-টিন সার্টিফিকেটের জন্য অনলাইনে আবেদন করা খুবই সহজ। আবেদন করার পূর্বে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সাথে রাখুন:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card)
- সক্রিয় মোবাইল নম্বর
- বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা
ধাপসমূহ:
- প্রথমে এনবিআর-এর ই-টিন পোর্টাল (secure.incometax.gov.bd) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
- ‘Register’ বাটনে ক্লিক করে নতুন ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড ও সিকিউরিটি প্রশ্ন সেট করে রেজিস্টার করুন।
- আপনার মোবাইল নম্বরে প্রাপ্ত ভেরিফিকেশন কোডটি দিয়ে অ্যাকাউন্ট এক্টিভ করুন।
- এখন ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে সাইটে লগইন করে ‘TIN Application’ এ যান।
- আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম, এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ এবং ঠিকানার তথ্য নির্ভুলভাবে প্রদান করুন।
- সব তথ্য যাচাই করে সাবমিট অপশনে ক্লিক করুন।
- ‘View Certificate’ অপশনে ক্লিক করলে সাথে সাথেই আপনার টিন সার্টিফিকেট স্ক্রিনে দেখা যাবে এবং সেখান থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন।
টিন সার্টিফিকেট নবায়ন ও তথ্য সংশোধন করার নিয়ম
ই-টিন সার্টিফিকেট প্রতি বছর নবায়ন করার প্রয়োজন হয় না। তবে আপনার নাম, ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সাইটে লগইন করে এডিট বা সংশোধন আবেদন করা যায়।
- ই-টিন ওয়েবসাইটের প্রবেশ করুন এবং ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।
- ড্যাশবোর্ড থেকে ‘Edit/Correct/Update’ অপশন নির্বাচন করুন।
- যে তথ্যটি সংশোধন করতে চান তা পরিবর্তন করে প্রয়োজনীয় ফাইল বা প্রমাণপত্র সংযুক্ত করে সাবমিট করুন।
- অনুমোদন সম্পন্ন হলে আপনার আপডেটেড ই-টিন সার্টিফিকেট ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম
অনেক সময় অপ্রয়োজনে টিন সার্টিফিকেট খোলা হয়ে গেলে বা করযোগ্য আয় না থাকলে টিন বাতিল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আইন অনুযায়ী টিন নম্বর পুরোপুরি ডিলিট বা বাতিল করার সরাসরি অনলাইন অপশন নেই, তবে কর ফাইল নথিস্থ (Archive) করা যায়। নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:
- আপনার কর অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনার (Circle Officer) বরাবর টিন বাতিল বা নথিস্থ করার জন্য লিখিত আবেদন জমা দিতে হবে।
- আবেদন করার আগে অন্তত টানা ৩ বছর করযোগ্য আয় না থাকলে ‘শূন্য রিটার্ন’ দাখিল করতে হবে।
- তৃতীয় বছর শূন্য রিটার্ন দাখিলের সাথে আপনার ফাইল নথিস্থ রাখার জন্য উপযুক্ত কারণ দর্শিয়ে দরখাস্ত পেশ করতে হবে।
- উপ-কর কমিশনার আবেদন পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট হলে আপনার ফাইলটি নিষ্ক্রিয় বা নথিস্থ করে রাখবেন।
অনলাইন থেকে টিন সার্টিফিকেট সংগ্রহ ও ডাউনলোড
<img decoding=”async” class=”size-full wp-image-3879 aligncenter” src=
